সহজ কথায় সুস্থ ও ফিট থাকার জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সাদা আটার বদলে লাল আটা রাখা উচিত।
পরিশোধিত সাদা আটার তুলনায় লাল আটায় গমের বাঙ্কার বা ভুসি এবং অঙ্কুর অক্ষত থাকে। ফলে এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার (আঁশ), ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়।
এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নি
য়ন্ত্রণ করে ডায়াবেটিস কমায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
সাধারণ সাদা রুটি বাদ দিয়ে পুষ্টিগুণে ভরপুর এই হোল হুইট ফ্লাওয়ার বা লাল আটার রুটি খাওয়া শুরু করলে শরীর ভেতর থেকে শক্তিশালী ও রোগমুক্ত থাকে। এটিই হতে পারে আপনার সুস্থ জীবনের প্রথম সহজ পদক্ষেপ।
লাল আটা ও সাদা আটার মূল পার্থক্য কী?
আমরা প্রতিদিন যে ধবধবে সাদা আটার রুটি খাই, তা তৈরি হয় গমের ভেতরের নরম অংশ থেকে। গমের ওপরের পুষ্টিকর খোসা বা ভুসি ছেঁটে ফেলে এটি তৈরি করা হয়। ফলে এর সব ফাইবার ও ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়।
অন্যদিকে লাল আটা তৈরি হয় আস্ত গম পিষে। এর বৈজ্ঞানিক নাম হোল হুইট ফ্লাওয়ার (Whole Wheat Flour)। এতে গমের তিনটি অংশই, ভুসি (Bran), অঙ্কুর (Germ) এবং ভেতরের অংশ (Endosperm) পূর্ণ থাকে।
লাল আটায় কী কী পুষ্টি উপাদান থাকে?
লাল আটায় প্রাকৃতিকভাবেই অনেক পুষ্টি থাকে যা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নিচে সাদা আটা ও লাল আটার একটি সহজ তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
|
পুষ্টি উপাদান (প্রতি ১০০ গ্রামে) |
সাদা আটা (Refined Flour) |
লাল আটা (Whole Wheat) |
শরীরে এর প্রভাব |
|
ফাইবার (আঁশ) |
খুবই কম (প্রায় ২.৭ গ্রাম) |
অনেক বেশি (প্রায় ১০-১২ গ্রাম) |
পেট পরিষ্কার রাখে ও হজম বাড়ায় |
|
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স |
প্রক্রিয়াজাতকরণে নষ্ট হয় |
প্রচুর পরিমাণে থাকে |
শরীরে শক্তি তৈরি করে |
|
আয়রন ও ম্যাগনেসিয়াম |
সামান্য থাকে |
উচ্চ মাত্রায় থাকে |
রক্তশূন্যতা দূর করে ও পেশি ভালো রাখে |
|
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) |
উচ্চ (রক্তে চিনি দ্রুত বাড়ায়) |
নিম্ন (রক্তে চিনি ধীরে বাড়ায়) |
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে |
লাল আটা খেলে শরীরের জন্য কী কী উপকার হয়?
প্রতিদিন ডায়েটে লাল আটা রাখলে আপনি যে ১০টি বড় সুবিধা পাবেন, তা নিচে সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো:
১. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে: লাল আটার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) কম। এর মানে হলো, এই আটার রুটি খেলে রক্তে হুট করে সুগার বা চিনি বেড়ে যায় না। এটি ধীরে ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখে।
২. দ্রুত ওজন কমায়: আপনি কি ওজন কমাতে চান? তাহলে সাদা রুটি বা ভাত বাদ দিয়ে লাল আটার রুটি খাওয়া শুরু করুন । এর ফাইবার বা আঁশ পেট অনেকক্ষণ ভরিয়ে রাখে। ফলে বারবার ক্ষুধা লাগে না এবং অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস কমে যায়।
৩. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে: লাল আটার ভুসি পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে । এটি মল নরম করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে সচল রাখে। ফলে পুরনো কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও দ্রুত দূর হয়।
৪. হার্ট বা হৃৎপিণ্ড ভালো রাখে: গবেষণায় দেখা গেছে, আস্ত শস্য বা হোল গ্রেন জাতীয় খাবার রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (LDL) কমায়। এটি হার্টের ধমনী পরিষ্কার রাখে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
৫. দীর্ঘক্ষণ এনার্জি বা শক্তি দেয়: সাদা আটার খাবার দ্রুত এনার্জি দেয়, আবার দ্রুত কমেও যায়, ফলে শরীর ক্লান্ত লাগে। কিন্তু লাল আটার জটিল কার্বোহাইড্রেট শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি জুগিয়ে রাখে।
৬. রক্তশূন্যতা দূর করে: লাল আটায় প্রচুর আয়রন থাকে। আয়রন শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে, যা ক্লান্তি ও অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা দূর করতে দারুণ কার্যকরী।
৭. ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়: এতে রয়েছে ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এগুলো শরীরের ক্ষতিকর কোষ নষ্ট করে এবং কোলন ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে।
৮. উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার কমায়: লাল আটায় থাকা ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাসিয়াম রক্তনালীকে শিথিল বা শান্ত রাখে। এর ফলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয় এবং ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৯. ত্বক ও চুল সুন্দর করে: ভিটামিন বি এবং জিংক সমৃদ্ধ হওয়ায় লাল আটা ভেতর থেকে ত্বককে উজ্জ্বল করে এবং চুলের গোড়া শক্ত করতে সাহায্য করে।
১০. হাড় ও দাঁত শক্ত করে: এতে থাকা ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম আমাদের শরীরের হাড়ের ঘনত্ব বাড়ায় এবং দাঁতকে মজমুত রাখে।
লাল আটা খাওয়া কীভাবে শুরু করবেন?
অনেকেই মনে করেন লাল আটার রুটি শক্ত হয় বা খেতে ভালো লাগে না। এটি আসলে ভুল ধারণা। প্রথম প্রথম একটু অন্যরকম লাগলেও মাত্র ১ সপ্তাহ খেলে এটি আপনার অভ্যাসে পরিণত হবে।
টিপস: লাল আটার খামির বা কাই তৈরি করার সময় হালকা গরম পানি ব্যবহার করুন এবং মাখানোর পর ১০-১৫ মিনিট ঢেকে রাখুন। এতে রুটি একদম নরম ও তুলতুলে হবে।
আপনি চাইলে প্রথমে অর্ধেক সাদা আটা এবং অর্ধেক লাল আটা মিশিয়ে খাওয়া শুরু করতে পারেন। আস্তে আস্তে সাদা আটার পরিমাণ কমিয়ে পুরোপুরি লাল আটা খাওয়ার অভ্যাস করুন।
লাল আটা নিয়ে চিকিৎসকরা কী বলেন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিনের দানাদার খাদ্যের অন্তত অর্ধেক অংশ হওয়া উচিত আস্ত শস্য বা হোল গ্রেন।
হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর (Harvard T.H. Chan School of Public Health) একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন সাদা আটার বদলে নিয়মিত লাল আটার মতো হোল গ্রেন খাবার খান, তাদের:
- হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় ২১% কমে যায়।
- টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমে যায়।
সুস্থ থাকতে আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত?
সুস্থ থাকা কোনো কঠিন বিষয় নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
বাজার থেকে সস্তা ও চকচকে সাদা আটা কিনে এনে আমরা আসলে নিজের অজান্তেই শরীরে রোগ ডেকে আনছি। আজই আপনার মুদি দোকানের তালিকায় পরিবর্তন আনুন। সাদা আটার প্যাকেট বাদ দিয়ে খাঁটি লাল আটা কিনুন। পরিবারের সবাইকে প্রতিদিন অন্তত একবেলা লাল আটার রুটি খাওয়ার অভ্যাস করান।
এই একটিমাত্র ছোট পরিবর্তন আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে দীর্ঘকাল ডাক্তার ও ওষুধের খরচ থেকে দূরে রাখবে। আজ থেকেই শুরু করুন, সুস্থ থাকুন!